ঢাকা ০৮:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগী প্রধান শিক্ষক, অপপ্রচারে ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থী

  • বিশেষ প্রতিনিধি :
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৪৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ২১১ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অবসান ঘটাতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বাড়ানোসহ শিক্ষার মান উন্নয়নে নানা উদ্যোগের ফলে বিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিলেও তার এই উদ্যোগে ক্ষুব্ধ হয়েছেন কিছু শিক্ষক। অভিযোগ উঠেছে, এই শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্য ও অতীতের অনিয়ম ঢাকতে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

 

অভিযোগ উঠেছে, এই শিক্ষকরা পূর্ববর্তী প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের ছত্রছায়ায় কোচিং বাণিজ্য চালাতেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং পাঠদানে শিক্ষকদের বাধ্য করায় এই চক্রটি তাকে সরাতে ষড়যন্ত্র করছেন।

 

জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই মো. আলাউদ্দিন স্কুলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নিয়মিত ক্লাসে পাঠদান শুরু করেছেন। কিন্তু এই পরিবর্তনকে ভালোভাবে নেননি কিছু শিক্ষক। সম্প্রতি তিনি মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালক বরাবর বিদ্যালয়ে অডিট চেয়ে একটি আবেদন করেছেন।

 

 

বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন কোচিং নিরুৎসাহিত করায় কিছু শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্য ও ব্যাচ পড়ানো বন্ধের পথে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করকরে বিভিন্ন দপ্তরে দায়ের করছেন বলে জানা গেছে। এমনকি সম্প্রতি একটি গোপন বৈঠকে তাকে বদলির ষড়যন্ত্রেরও অভিযোগ উঠেছে।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন ০৭-০৭-২০১২ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করে ১২-০৬-২০২৪ তারিখ পর্যন্ত একযুগ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি জেলা শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ একসাথে তিনটি দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া সাতক্ষীরা সদরের সাবকে এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সাথে যোগসাজস করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য করে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ফলে সাতক্ষীরা শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মাদ হাবিবুল্লাহ , সিনিয়র শিক্ষক মো. মমতাজ হোসেন , সহকারী শিক্ষক মোস্তফা মনিরুজ্জামান, মো. খোরশেদ আলম সিনিয়র শিক্ষকসহ আরও অনেকে। উক্ত শিক্ষকরা বিভিন্ন বাসা বাড়িতে ব্যাচ করে নিজ বাসা ও ভাড়া বাসায় পড়াচ্ছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় তাদের এই ব্যাচ পড়ানো প্রায় বন্ধের পথে। এজন্য তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

 

তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন অবস্থায় এসএম আব্দুল আল মামুন বিভিন্ন ফান্ডের টাকা নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে আত্মসাৎ করেন। তার অপকর্মের সঙ্গে উক্ত শিক্ষকরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন অডিট চাওয়ায় মো. আলাউদ্দিনকে বদলি করাতে উঠে পড়ে লেগেছেন চক্রটি। নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, মমতাজ হোসেন, মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, মো. খোরশেদ আলম, মোস্তফা মনিরুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান এবং জান্নাতুল ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক এই ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি আরও বলেন, পিকনিকের নামে এই শিক্ষকরা সম্প্রতি বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যেয়ে সাবেক শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে বৈঠক করে এসেছেন। সেখানে তারা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বদলি এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করার পরিকল্পনা করেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে দায়ের করেছেন। জেলা প্রশাসন এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছে বলে জানা গেছে। তবে, অভিযুক্ত শিক্ষকরা নানাভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বিভিন্ন মহলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং বিদ্যালয়কে ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

 

 

বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, স্কুলে এখন পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে, যা আগে ছিল না। তারা মনে করছেন, ষড়যন্ত্রকারীদের দমন না করা হলে বিদ্যালয়ের এই ইতিবাচক পরিবর্তন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

 

আল আমিন নামে একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ আমি একজন গরিব মানুষ। আমি চাই আমাদের সন্তানরা স্কুলে পড়াশোনা করুক, কোচিং সেন্টারে নয়। প্রধান শিক্ষক সঠিক কাজ করছেন। তাকে হেয় করার যেকোনো প্রচেষ্টা দুঃখজনক। শিক্ষদের মধ্যে দুটি গ্রুপ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করে তাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে। না হলে আমাদের বাচ্চার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 

অভিযোগের বিষয়ে সিনিয়র শিক্ষক মো. খোরশেদ আলম বলেন, নীতিমালার বাইরে কোচিং করানো হয় না। ডিসি স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৭টার আগে এবং বিকাল ৫টার পরে কোচিং করানো হয়। আমরা পিকনিকের দাওয়াতে বাগেরহাটে গিয়েছিলাম তৎকালিন প্রধান শিক্ষক আনিস স্যারের অনুমতি নিয়ে। এছাড়া আমাদের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সেগুলো সঠিক না।আমরা কোন নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলাম না।

 

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক আজাদ হোসেন বলেন, সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সাতক্ষীরা দুটি সরকারি স্কুলে যেয়ে মাত্র কয়েকজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের দেখেন। অধিকাংশ ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী নেই। শিক্ষরাও ক্লাস নেন না এটি খুবই অন্যায়। শুধুমাত্র কোচিংমুখী করানোর জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের ঠিক মত ক্লাসে নেন না এটি অত্যান্ত দু:খজনক। এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সাবেক একজন এমপি জেলার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।

 

তিনি আরও বলেন, কোচিং বাণিজ্যেকে কেন্দ্র করে গার্লস স্কুলে শিক্ষকদের মধ্যে দুটি গ্রুপ হয়ে গেছে এটা দু:খজনক। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বকালে যেমন তদন্ত হওয়া উচিত, তেমনি আগের প্রায় ১২ বছরের কার্যকালও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষার পরিবেশ ভালো করতে হলে শিক্ষকদের গ্রুপ বন্ধের পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত করে দোষী শিক্ষক ও অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না নিলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আবারও বিঘ্নিত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের শিক্ষানীতি পরিবর্তন দরকার। যেত শিক্ষার্থীরা কোচিংমুখী না হয়। এমন শিক্ষানীতি হতে হবে তারা যেন ক্লাস থেকে সবকিছু শিক্ষতে পারবে। তাদের আর কোচিং করতে হবে না।

 

 

অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিনের বলেন, তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি যদি অপরাধী হই তাহলে আমি অডিট চাইতে পারতাম না। আমি চাই তদন্ত হোক এবং আমি সমস্ত অনিয়মের অভিযোগের জবাব দিতে আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমি মাত্র ৫মাসের একটু বেশি সময় দায়িত্বভার পালন করছি। স্কুলে আগের পরিবেশ এবং আমার যোগদানের পরের পরিবেশ খোজ নিয়ে দিখেন। ভালো করেছি নাকি খারাপ করেছি।

তিনি আরো বলেন, “ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে যেয়ে আমার বিরুদ্ধে কিছু শিক্ষক একাট্টা হয়েছ। আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের চেষ্টা করছি। বাকিটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।”

সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা অফিসার আবুল খায়ের বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন সাহেব যোগদানের পর আমাকে একদিন ডাকলেন। আমি যেয়ে দেখলাম প্রায় সব ক্লাসে শিক্ষার্থীদের হার খুব কম। তার স্কুল বাদ দিয়ে প্রাইভেট পড়তে যায়। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্রীদের উপস্থিতির বিষয় প্রতিদিন আমাকে অবহিত করে। তবে আমি খোজ নিয়ে জানতে পেরেছি প্রাইভেট পড়ানোকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে দুটো গ্রপ হয়ে গেছে। তবে জেলা প্রশাসক স্যার এবং আমি নিয়মিত তদরাকি করছি। ক্লাস ঠিক মতো চলছে। শিক্ষার পরিবেশ এবং উপস্থিতির হার আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি ডিসি স্যারকে সাথে নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো।

খবর টি শেয়ার করুন :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Munna Khan

সর্বাধিক পঠিত

নাটোর-৪ আসনে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় দায়িত্ব পেলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য মোঃ হাফিজুর রহমান।

সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগী প্রধান শিক্ষক, অপপ্রচারে ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থী

প্রকাশের সময় : ০৬:৪৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অবসান ঘটাতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বাড়ানোসহ শিক্ষার মান উন্নয়নে নানা উদ্যোগের ফলে বিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিলেও তার এই উদ্যোগে ক্ষুব্ধ হয়েছেন কিছু শিক্ষক। অভিযোগ উঠেছে, এই শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্য ও অতীতের অনিয়ম ঢাকতে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

 

অভিযোগ উঠেছে, এই শিক্ষকরা পূর্ববর্তী প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের ছত্রছায়ায় কোচিং বাণিজ্য চালাতেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং পাঠদানে শিক্ষকদের বাধ্য করায় এই চক্রটি তাকে সরাতে ষড়যন্ত্র করছেন।

 

জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই মো. আলাউদ্দিন স্কুলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও নিয়মিত ক্লাসে পাঠদান শুরু করেছেন। কিন্তু এই পরিবর্তনকে ভালোভাবে নেননি কিছু শিক্ষক। সম্প্রতি তিনি মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালক বরাবর বিদ্যালয়ে অডিট চেয়ে একটি আবেদন করেছেন।

 

 

বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন কোচিং নিরুৎসাহিত করায় কিছু শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্য ও ব্যাচ পড়ানো বন্ধের পথে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করকরে বিভিন্ন দপ্তরে দায়ের করছেন বলে জানা গেছে। এমনকি সম্প্রতি একটি গোপন বৈঠকে তাকে বদলির ষড়যন্ত্রেরও অভিযোগ উঠেছে।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন ০৭-০৭-২০১২ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করে ১২-০৬-২০২৪ তারিখ পর্যন্ত একযুগ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি জেলা শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ একসাথে তিনটি দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া সাতক্ষীরা সদরের সাবকে এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সাথে যোগসাজস করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য করে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ফলে সাতক্ষীরা শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মাদ হাবিবুল্লাহ , সিনিয়র শিক্ষক মো. মমতাজ হোসেন , সহকারী শিক্ষক মোস্তফা মনিরুজ্জামান, মো. খোরশেদ আলম সিনিয়র শিক্ষকসহ আরও অনেকে। উক্ত শিক্ষকরা বিভিন্ন বাসা বাড়িতে ব্যাচ করে নিজ বাসা ও ভাড়া বাসায় পড়াচ্ছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় তাদের এই ব্যাচ পড়ানো প্রায় বন্ধের পথে। এজন্য তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

 

তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন অবস্থায় এসএম আব্দুল আল মামুন বিভিন্ন ফান্ডের টাকা নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে আত্মসাৎ করেন। তার অপকর্মের সঙ্গে উক্ত শিক্ষকরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন অডিট চাওয়ায় মো. আলাউদ্দিনকে বদলি করাতে উঠে পড়ে লেগেছেন চক্রটি। নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, মমতাজ হোসেন, মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, মো. খোরশেদ আলম, মোস্তফা মনিরুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান এবং জান্নাতুল ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক এই ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি আরও বলেন, পিকনিকের নামে এই শিক্ষকরা সম্প্রতি বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যেয়ে সাবেক শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে বৈঠক করে এসেছেন। সেখানে তারা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বদলি এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করার পরিকল্পনা করেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে দায়ের করেছেন। জেলা প্রশাসন এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছে বলে জানা গেছে। তবে, অভিযুক্ত শিক্ষকরা নানাভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বিভিন্ন মহলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং বিদ্যালয়কে ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

 

 

বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, স্কুলে এখন পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে, যা আগে ছিল না। তারা মনে করছেন, ষড়যন্ত্রকারীদের দমন না করা হলে বিদ্যালয়ের এই ইতিবাচক পরিবর্তন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

 

আল আমিন নামে একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ আমি একজন গরিব মানুষ। আমি চাই আমাদের সন্তানরা স্কুলে পড়াশোনা করুক, কোচিং সেন্টারে নয়। প্রধান শিক্ষক সঠিক কাজ করছেন। তাকে হেয় করার যেকোনো প্রচেষ্টা দুঃখজনক। শিক্ষদের মধ্যে দুটি গ্রুপ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করে তাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে। না হলে আমাদের বাচ্চার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 

অভিযোগের বিষয়ে সিনিয়র শিক্ষক মো. খোরশেদ আলম বলেন, নীতিমালার বাইরে কোচিং করানো হয় না। ডিসি স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৭টার আগে এবং বিকাল ৫টার পরে কোচিং করানো হয়। আমরা পিকনিকের দাওয়াতে বাগেরহাটে গিয়েছিলাম তৎকালিন প্রধান শিক্ষক আনিস স্যারের অনুমতি নিয়ে। এছাড়া আমাদের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সেগুলো সঠিক না।আমরা কোন নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলাম না।

 

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক আজাদ হোসেন বলেন, সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সাতক্ষীরা দুটি সরকারি স্কুলে যেয়ে মাত্র কয়েকজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের দেখেন। অধিকাংশ ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী নেই। শিক্ষরাও ক্লাস নেন না এটি খুবই অন্যায়। শুধুমাত্র কোচিংমুখী করানোর জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের ঠিক মত ক্লাসে নেন না এটি অত্যান্ত দু:খজনক। এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সাবেক একজন এমপি জেলার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।

 

তিনি আরও বলেন, কোচিং বাণিজ্যেকে কেন্দ্র করে গার্লস স্কুলে শিক্ষকদের মধ্যে দুটি গ্রুপ হয়ে গেছে এটা দু:খজনক। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বকালে যেমন তদন্ত হওয়া উচিত, তেমনি আগের প্রায় ১২ বছরের কার্যকালও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষার পরিবেশ ভালো করতে হলে শিক্ষকদের গ্রুপ বন্ধের পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত করে দোষী শিক্ষক ও অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না নিলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আবারও বিঘ্নিত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের শিক্ষানীতি পরিবর্তন দরকার। যেত শিক্ষার্থীরা কোচিংমুখী না হয়। এমন শিক্ষানীতি হতে হবে তারা যেন ক্লাস থেকে সবকিছু শিক্ষতে পারবে। তাদের আর কোচিং করতে হবে না।

 

 

অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিনের বলেন, তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি যদি অপরাধী হই তাহলে আমি অডিট চাইতে পারতাম না। আমি চাই তদন্ত হোক এবং আমি সমস্ত অনিয়মের অভিযোগের জবাব দিতে আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমি মাত্র ৫মাসের একটু বেশি সময় দায়িত্বভার পালন করছি। স্কুলে আগের পরিবেশ এবং আমার যোগদানের পরের পরিবেশ খোজ নিয়ে দিখেন। ভালো করেছি নাকি খারাপ করেছি।

তিনি আরো বলেন, “ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে যেয়ে আমার বিরুদ্ধে কিছু শিক্ষক একাট্টা হয়েছ। আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের চেষ্টা করছি। বাকিটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।”

সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা অফিসার আবুল খায়ের বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন সাহেব যোগদানের পর আমাকে একদিন ডাকলেন। আমি যেয়ে দেখলাম প্রায় সব ক্লাসে শিক্ষার্থীদের হার খুব কম। তার স্কুল বাদ দিয়ে প্রাইভেট পড়তে যায়। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্রীদের উপস্থিতির বিষয় প্রতিদিন আমাকে অবহিত করে। তবে আমি খোজ নিয়ে জানতে পেরেছি প্রাইভেট পড়ানোকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে দুটো গ্রপ হয়ে গেছে। তবে জেলা প্রশাসক স্যার এবং আমি নিয়মিত তদরাকি করছি। ক্লাস ঠিক মতো চলছে। শিক্ষার পরিবেশ এবং উপস্থিতির হার আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি ডিসি স্যারকে সাথে নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো।